যাই হোক, আমাদের সেই পুরনো পথের সাথী চান্দের গাড়ীকে সঙ্গী করে আবার নীলাচলের নীলিমায় হারাতে বের হয়ে পড়লাম পথের খোঁজে। এত সবুজ একটানা দেখেও চোখের ক্লান্তি আসে না। চোখের ব্যায়ামের সাথে ফুসফুসে প্রবেশ করছে বিশুদ্ধ বাতাস। নীলাচল শহর থেকে বেশি দূরে নয়। মাত্র ৫ কি.মি। তাই বের হয়ে বেশিক্ষণ সময় লাগলো না নীলাচল পৌঁছাতে। নীলাচল পৌঁছে যথারীতি আমরা টিকেট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলাম। চারদিকে কী শান্ত সবুজের সমাহার। স্থিরতার মাঝে সবুজের অনাবিল দিগন্তে ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘের আস্তরণ। এখনও মেঘ ভেলা বানানো শুরু করেনি। আর একটু বিকেল হলে আকাশের নীল দিগন্ত থেকে ছুটে আসবে মেঘের ভেলা এই সবুজ পাহাড় সারিকে গ্রাস করতে।

নীলাচল পর্যটন স্পট খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে। আমরা ক্রমশ সামনে আগাতে লাগলাম। প্রবেশের পথেই পেয়েছিলাম ঝুলন্ত নীলা। পর্যটকদের সুবির্ধাথে এখানে বেশ কয়েকটা পয়েন্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এক এক জায়গায় থেকে পাহাড়ের দৃশ্য এক এক রকম দেখায়। তাই তো বান্দরবান শহরবাসীর কাছে এত প্রিয় নীলাচল। আমার এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি এখান থেকে পুরো বান্দরবান শহর দেখা যায়। আমরা নীলাচল থেকে দেখতে পেলাম দূরের সেই স্বর্ণ মন্দির। হাঁটতে হাঁটতে আমরা চলে এসেছি মূল নীলাচলে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে সাজানো হয়েছে বিভিন্ন পয়েন্ট। নীহারিকা, ভ্যালেন্টাইন পয়েন্ট আমাকে বিশেষভাবে আর্কষিত করলো।
এখানে প্রকৃতি যেন সেজেছে কোনো শিল্পীর তুলিতে। প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচুতে নীলাচল আপন খেয়ালে সুন্দর। এখানে বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত সব ঋতুতে মেঘেরা খেলা করতে আসে। বর্ষায় যেমন থাকে মন খারাপি মেঘ, তেমনেই শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ জমা হয় শীতের প্রতীক্ষায়। আর শীত আসলে সেই কুয়াশাচ্ছন্ন মেঘ। এক এক ঋতুতে এক এক রকম মেঘের খেলা। দূরের ওই মেঘেরা পাহাড়ের কোলে আবার জমা শুরু হয়েছে আর আমরা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছি।
বাবার চোখটা এখন স্বপ্নবিলাসী মানুষের মতো লাগছে। পাহাড় দুনিয়ার কঠিনতম মানুষকে ভেঙে ফেলে তার দাম্ভিকতায়, আর তার কোমনীয় স্পর্শে আবার নতুন করেও স্বপ্ন দেখতে শেখায়। বাবা এখনও স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। এই স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসার মধ্যেই তো লুকিয়ে আছে জীবনের চালিকা শক্তি।

বাবা পাহাড় দেখছে। দূরের সেই পাহাড়। আঙুলের ইশারায় মাকে দেখাচ্ছে পাহাড়ি রূপ। দূর দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ে ঢালে ঢালে আঁকাবাঁকা রাস্তা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো চলে গেছে, তা দেখে কি বাবা অভিভূত হয়েছিল? না কি বিস্মিত হয়েছিল পাহাড়ি পাড়ার সেই দেব শিশুদের দেখে যারা ছুটে চলছে ওই মেঘের পিছে? পাহাড়ি পাড়ার পাশ দিয়ে যেন চিকন রেখার মতো বয়ে গেছে সাংগু নদী। সূর্যের সোনালী রোদে রূপালি এক আস্তর যেন লেগেছিল সে নদীতে। নীলাচলের সূর্যাস্ত না কি মনে স্বর্গীয় অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ রেখে দিয়েছে বিধাতা। যেন আমাদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন- কি পারবে একটা পাহাড় বানাতে? পারবে না, এরপরও আমার কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?
সূর্য যখন ডুবু ডুবু তখনই বাবার জাম্বুরা, আনারস খাবার কথা মনে পড়লো। নিচে তিনি দেখে এসেছিলেন নানা সুস্বাদু ফলের পসরা। চলে এলাম নিচে জাম্বুরা আনারস সংগ্রহে। নিচে এক পাহাড়ি দাদার দোকানে দেখলাম খুব ভীড়। এর হেতু খুঁজে পেলাম। উনি আনারস জাম্বুরা ভর্তা বানিয়ে দিচ্ছেন, সাথে প্রভাইড করছেন থালা বাটি। খেয়ে আবার ফেরত দিয়ে যেতে হবে। যদিও এখানে দশ টাকার জিনিস বিশ টাকা দিয়ে কিনে খেতে হয় তবে এ ব্যাপারটা ভাল লাগলো। সেল্ফ সার্ভিস। আমিও কলা, ভাতিজা ভাতিজীদের জন্য চিপ্স নেবার পর দাদাকে বললাম আমাকে কড়া করে ফল বানিয়ে দেন। পাশে দিদি ছিলেন। তিনি হেসে বললেন, বানিয়ে দিলে দশ টাকা বেশি দিতে হবে। বানাতে অনেক কষ্ট।

আমি অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে সার্ভিস নিতে রাজি হয়ে গেলাম। আমি দেখতে চাই তারা কীভাবে আনারস জাম্বুরা ভর্তা বানায়। আমার সামনেই আনারস চর্তুভুজাকৃতি করে ছোট কিউব করে কাটা হলো। আর জাম্বুরা ছিলে পাত্রে রাখলেন। এবার সরিষা, কাসুন্দির সাথে পেঁয়াজ মিশানোর পর বের করলেন ইয়া ছোট্ট সাইজের মরিচ। মরিচের সাইজ দেখে হেসে দিলাম। আমার অবস্থা দেখে দিদি বললো, দাদা এখন হাসছেন, ভর্তা খাবার পর কিন্তু কাঁদবেন। আমিও ছ্যা করে বললাম, এইটুকু মরিচে আর কত ঝাল হবে?
বাটি নিয়ে রওনা হলাম আমাদের আস্তানার দিকে। আব্বা আম্মা ভাইয়া ভাবী বসে আছে পর্যবেক্ষন টাওয়ারের নিচে। আমি যাবার পর নিচের একটা পয়েন্টে নেমে বেঞ্চে বসলাম সবাই। এরপর খাওয়ার পালা। প্রতি লোকমায় জিহবা জ্বলে মাথার তালুতে ঝাল উঠে যাবার পর একটা কথার মাজেজা এতদিন পর বুঝলাম, ছোট মরিচে ঝাল বেশি। গণ বকার শিকার হলেও ভর্তাটা সুস্বাদু ছিল বিধায় তা গায়ে লাগলো না।

খাওয়ার পর্ব শেষে ভান্ড বাটি ফেরত দিয়ে আসার পর এবার বিদায়ের পালা। এবার সূর্য পুরোপুরি ডুবে যাচ্ছে। মেঘ আর রোদের সাথে লুকোচুরি খেলা শেষে সূর্য আমাদের জানাচ্ছে বিদায়। চারপাশে শীতল এক নরম পরশ অনুভব করলাম। দূর পাহাড়ের ওই নীল আকাশ কমলা রংয়ের আস্তরে ঢেকে গেছে। পাহাড়ের সবুজ কোলে আগুনরঙা সূর্যাস্ত দেখে আমি অবাক হই না। তবে বাবা অবাক নয়নে তাকিয়ে ছিলেন। তার যে এবার প্রথম বান্দরবান দর্শন। এবার দিন শেষে পথিকের ঘরে ফেরার পালা। আমাদের বাবার সাথে বান্দরবান দর্শনেরও শেষ হলো। পরের দিন সকালের বাসে আমরা চলে যাব প্রাণের শহর ছেড়ে কক্সবাজারের পথে, তবে যাবার আগে শেষ করতে চাই সুন্দর একটা গল্প দিয়ে।
বান্দরবানের নাম কেন বান্দরবান হলো তা নিয়ে আছে নানান গল্প। তবে শত শত বছর আগে যখন এখানে মানুষের বসতি সেভাবে গড়ে ওঠেনি তখন পাহাড়ের কোলে দাঁড়ালে দূর থেকে শোনা যেত পাখিদের কলকাকলি। সে সময় এ অঞ্চলে ছিল প্রচুর বানরের বিচরন। বানরগুলো শহরের ধারেকাছের খাল বা ছড়া পাড়ি দিয়ে সারি বেঁধে পাশের জঙ্গলে যেত খাবারের খোঁজে। বানরের এই সারিবদ্ধভাবে খাল পাড়ের দৃশ্যকে দূর থেকে বাঁধের মতো মনে হয়। কোন রশিক মারমা তা দেখে নাম দেয় “ম্যাকছে”। বাংলা ভাষায় যার অর্থ বাঁনরের বাঁধ। লোক মুখে বির্বতনে পরিবর্তিতে তাই বান্দরবান নামের সূচনা করে।
Comments
Post a Comment